Skip to main content

উৎসব ১

"এরা কারা! চা খেতে বাইরে যাচ্ছি, বলে কিনা স্যার খাতায় এন্ট্রি করে যান!"
উৎসব শুরু হয়ে গেছে। শহরতলানীর এক জনবহুল স্টেশনে আমি তখন অসহায়, ট্রেনের অপেক্ষায়। বেশ মালুম পাচ্ছি একটা দুটো ট্রেন ছাড়তেই হবে, নইলে মোবাইল ফোন, কিছু টাকা এবং জীবনের মায়া ত্যাগ করতে হয়। জীবন অতটা দামি কিছু নয়, টাকা সে তো আছে সাকুল্যে শ'খানেক। কিন্তু মোবাইল ফোনটা গেলে বাকি জীবন চলবে কি করে সেই ভেবেই থমকে গেছি। এমন সময় এই চা খাওয়ার মন্তব্যে আমার স্বভাব কৌতূহলী মস্তিষ্ক কানকে সজাগ করে দিল। উৎসবমুখর আবালবৃদ্ধের সম্মিলিত ক্যাকোফোনিকে আমার প্যারাইটাল লোব কিছুটা মিউট করে এই ভদ্রলোকের কথা গুলোকে স্পষ্ট করে তুলল।
ভদ্রলোক শিক্ষকতা করেন একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। তাঁর কথায়, ইদানিং কলেজের এইচ আর (HR) ডিপার্টমেন্ট কিছু নতুন নিয়ম চালু করেছে। যার একটা হল নির্দিষ্ট ফ্লোর থেকে বেরতে গেলে খাতায় এন্ট্রি করতে হবে, কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি ইত্যাদি। ক্যান্টিনে চা খেতে গেলেও অতএব এখন খাতায় এন্ট্রি করতে হচ্ছে! শুধু এটুকুই নয়, প্রতি ক্লাসে সি সি ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং শিক্ষকদের প্রতি কড়া নজরদারি চালু হয়েছে যাতে তাঁরা ফাঁকি দিতে না পারেন। অতএব ভদ্রলোকের বিস্ময়জনিত প্রশ্ন, আচ্ছা বলুন তো এই ভাবে নজর বন্দী করে আমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব?
উতসবকাঙ্গাল জনতার মহা সোৎসাহে ক্লিষ্ট বেচারা আমি কোনো কথাই বলে উঠতে পারলাম না। আমার বলা হলো না যে surveillance বা নজরদারির এই নয়া কৌশল নিয়ে গোটা দুনিয়া তে আজ তোলপার চলছে। এতে শুধু আপনার মতো শিক্ষকদের ব্যক্তি স্বতন্ত্র ধ্বস্ত হচ্ছে না, সামগ্রিক সমাজে এর গভীর অ-সুখের লক্ষন গুলো ক্রমশ স্পস্ট থেকে স্পস্টতর হচ্ছে।
গোপন নজরদারির বিষয়ে বিশ্বকে প্রথম চমকে দিয়েছিলেন এডওয়ার্ড স্নোডেন। স্নোডেন চাকরী করতেন আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সি আই এ-তে। ২০১৩ সালে ন্যাসানাল সিকিউরিটি এজেন্সির গোপন নজরদারির মাধ্যমে সংগৃহিত গাদাগাদা নথি প্রকাশ করে দিলেন তিনি। চোরের উপর বাটপারি আর কি। সেই প্রথম বিশ্ব জানল নজরদারি ব্যাপারটা ঠিক কি।
২০১৩ সালের এই ঘটনার পর থেকেই উন্নত দুনিয়ায় এই নজরদারির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে।  আমাদের দেশে অবশ্য এ নিয়ে বিশেষ মাথা ব্যাথা নেই। বরং এসব সাদা চামড়ার লোকেদের বাহুল্য বলেই মনে করেছি। এবং সেটাই স্বাভাবিক। যে দেশের নাগরিকরা বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের ব্যাঙ্ক একাউন্ট এর বিস্তারিত তথ্য অন্যকে জানিয়ে দেয়, মায় এ টি এম কার্ডের পিন নাম্বার, সে দেশে নজরদারি বা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র নিয়ে আমাদের খুব বেশি মাথা ব্যাথা থাকবেনা এটাই গ্রাহ্য। শুধুমাত্র যখন  নজরদারির বিষম বোঝা নিজেদের ঘাড়ের উপর চেপে বসে তখন সামান্য চিঁহি রবে নিজের যন্ত্রণার উপশম খুঁজি।  কিন্তু রাসেলের ভাবনায় জারিত পশ্চিমী দুনিয়ার ভাবনা অন্য খাতে বইবে সেটাও সমান গ্রাহ্য।
"In our own day, there has been too much of a tendency towards authority, and too little care for the preservation of initiative. Men in control of vast organisations have tended to be too abstract in their outlook, to forget what actual human beings are like, and to try to fit men to systems rather than systems to men." - Bertrand Russel in  Authority and the Individual (1949)
 parliamentary assembly of the Council of Europe,  পেন আমেরিকা, কানাডিয়ান জার্নালিস্টস ফর ফ্রি এক্সপ্রেশনস, আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন এর মতো অনেক সংগঠন নজরদারির নানা উপসর্গ বিষয়ে আমাদের সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সব সংস্থার নানা প্রতিবেদন থেকে যা জানা যাচ্ছে তাতে বাস্তবিকই আমরা এক surveillance society তে বাস করছি।
পেন আমেরিকা 'র ২০১৩ সালের একটা সার্ভে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে আমেরিকার প্রতি ছয় জন লেখকের এক জন নজরদারির ভয়ে বিতর্কিত বিষয়ে লেখালেখি এড়িয়ে চলেন।
২০১৬ সালের একটা রিপোর্টে বলা হলো, নজরদারির অধীনে মানুষের স্বাভাবিক আচরণ বদলে যায়। এই altered behaviour ব্যক্তির দৈনন্দিন যাপনকে এবং সেই সঙ্গে সমাজকে এক গভীর অ-সুখে নিমজ্জিত করেছে। যে অ-সুখের উপসর্গ দেখলাম এই শিক্ষকের মধ্যে, নাছোড় নজরদারি যাকে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা থেকে বিরত করেছে। 

Comments